সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:০০ অপরাহ্ন

আবৃত্তির জন্য ছন্দজ্ঞান-মীর বরকত

  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ৭ মার্চ, ২০২১
  • ১৭৭ বার দেখেছে

ঢাকাঃ সাধারণত শব্দ কোনো বস্তু বা বিষয়ের অর্থ প্রকাশ করে। তখন শব্দটি থাকে জড়বস্তুর মতো অনড়, কোনোরূপ গতির সঞ্চার হয় না। যেমন ‘বই’, ‘গাড়ি’, ‘ফুল’ বলতে কতিপয় বস্তুরূপকেই বোঝায়। পাঠ্যাবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘তোমার হাতে ওটা কী?’ সাধারণত উত্তর হয় ‘বই’। পরের প্রশ্ন ‘বই নিয়ে কী কর?’ উত্তর হয় ‘পড়ি’। এখানে কিছু তথ্য পাওয়া গেল যে, ওই ব্যক্তির হাতে একটি বই আছে এবং সেটি পড়া হচ্ছে। ব্যক্তিটির মনোভাব বোঝা গেল না। অর্থাৎ তার মনের প্রতিক্রিয়া অব্যক্ত রয়েই গেল। কিন্তু একই প্রশ্নের উত্তরে সে যদি বলতো, ‘এটা যে বই সেটা সবাই জানে। জিজ্ঞেস করার কী আছে?’ দ্বিতীয়
প্রশ্নের উত্তরে যদি বলতো ‘হাতে বই নিয়ে মানুষ কী করে? খেলে?’ তাহলে  প্রশ্নকারীর সঙ্গে তার সম্পর্কটি যে বিশেষ ধরনের সেই মনোভাবটির পরিস্ফ‚টন ঘটতো।

কথোপকথনটির মধ্যে এক ধরনের গতির সঞ্চার হয়ে কথার জড়ত্ব ঘুচে তা বেগবান হয়ে উঠতো। দৈনন্দিন হাসি-কান্না-রাগ-বিরাগের বিষয় কয়েকটি শব্দের অর্থ প্রকাশই নয়। বরং অর্থের চেয়েও অধিক কিছু ব্যক্ত করা হয় আবেগ প্রকাশের মাত্রাভেদে। ‘ফুল’ সকলেরই প্রিয়। কিন্তু কেন এর প্রতি প্রবল আকর্ষণ সে প্রশ্নের উত্তরে অধিকাংশ ব্যক্তিই দ্বিধান্বিত হন। ফুল কেন ভালো লাগে তা সহজে ব্যক্ত করা যায় না। এরকমই ‘গান’ ‘মা’ ‘দেশ’কে কেমন লাগে তার উত্তরও এককথায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মনের অন্দরে এমন কিছু থাকে যা কেবল ‘কথা’ দিয়ে প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ যা কিছু সহজে প্রকাশযোগ্য নয়, তাইতো ‘অনির্বচনীয়’। কেন ভালো লাগে, মন্দই বা লাগে কেন, বিষন্তার কারণ কী, সেগুলি ব্যাখ্যাযোগ্য করে উপস্থাপন করা শক্ত কাজ। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর কবিতার একটি পঙ্ধসঢ়;ক্তি ‘কী বলেছি অভিমানে শুনো না শুনো না কানে বেদন দিও না প্রাণে ব্যাথার সময়।’

এই একটি পংক্তি দিয়ে কবি দুজনের মনের অন্দরে মান-অভিমানের বিরাজমান চরম অবস্থার বিষয়টি প্রকাশ করেছেন। একজনের আচরণে অপরজনের অন্তরে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তা মোচনের জন্য যত্নের প্রয়োজন হয়। অভিমানের সময় মানুষ যে কথা বলে তার আক্ষরিক অর্থ মানলে প্রবল প্রত্যাভিমানও সৃষ্টি হতে পারে। এতে দুটি মনের সঙ্গোপন বেদনার অনুরণন দানা বাঁধতে থাকে। এই কথাগুলোকে সহ বাক্যের ব্যাখ্যাতেও স্পষ্ট করা সম্ভব নয়। কথা কেবল অর্থ প্রকাশ করে যা থাকে স্থির।

কিন্তু মানুষের মন চলে দুরন্ত গতিতে। স্থির কথা দিয়ে গতিশীল মনের আবেগকে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। স্থির কথাকে গতিশীল করার জন্য প্রয়োজন হয় কথার জড়ত্ব দূর করার। মনের দোলাকে প্রকাশ করতে পারে কথার দোলা। তাই কথাকে শুধু ‘কথা’য় সীমাবদ্ধ না রেখে তার মধ্যে গতির সঞ্চার করতে হয়। তাতে মনের আবেগ মুক্ত হয়ে সৃষ্টি করবে ‘রস’। এই ‘রস’ আস্বাদনের জন্য দরকার পড়ে ছন্দের দোলা। কথাকে তার জড়ত্ব থেকে মুক্তি দেবার জন্য তার ‘প্যাটার্ন’ বদল করতে হবে। অর্থাৎ নবরূপে বিন্যাস করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন  “কথাকে ছন্দে বাঁধা। কিন্তু এ কেবল বাইরে বাঁধন অন্তরে মুক্তি। কথাকে তার জড়ধর্ম থেকে মুক্তি দেবার জন্যই ছন্দ। সেতারের তার বাঁধা থাকে বটে, কিন্তু তার থেকে সুর পায় ছাড়া। ছন্দ হচ্ছে সেই তার বাঁধা সেতার, কথার অন্তরের সুরকে সে ছাড়া দিতে থাকে। ধনুকের সে ছিলা, কথাকে সে তীরের মতো লক্ষ্যের মর্মের মধ্যে প্রক্ষেপ করে।”

গদ্য আপনমনে চলে, তার বিন্যাস ছড়ানো। কাব্যের দোলা দেওয়ার জন্য তাকে ছন্দে বেঁধে ফেলতে হয়। আবৃত্তিশিল্পীদের মধ্যে কেউ কেউ মতপ্রকাশ করেন, ছন্দকে কবিতার বন্ধন থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য তাকে ভেঙে ফেলতে হবে। কবিতার ভাব ছাপিয়ে তার অর্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আপেক্ষিক। ছন্দ একটি বিশেষ রীতিনীতি অবলম্বন করে চলে। অঙ্কের ফর্মুলার মতো নিবিড়ভাবে অনুসরণ করে চলতে হয়। ন্যূনতম ছন্দজ্ঞানের অভাব থাকলে ছন্দ অনুসরণ করে কবিতা পড়ায় বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়। ছন্দটি বুঝতে পারলে শিল্পীর জন্য তা আবৃত্তিসহায়ক হয়ে ওঠে। ছন্দবদ্ধ কবিতা বিশেষ তাল অনুসরণ করে চলে। কবি যখন নিজ ভাব প্রকাশের জন্য কবিতাটিকে স্বরবৃত্ত ছন্দে লিখলেন, তখন এর চাঞ্চল্য ও লাফিয়ে লাফিয়ে চলার ভঙ্গিটিকে রপ্ত করতে পারলে কবিতার মূল ভাবটিকেও ফুটিয়ে তোলা সহজতর হয়ে উঠবে। আমরা জানি, স্বরবৃত্ত ছন্দে মুক্তদল এবং রুদ্ধদল উভয়ই একমাত্রার। অর্থাৎ প্রত্যেকটি দল বা সিলেবলের উচ্চারণে সমান সময় ব্যয় হয়। সেক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে
এর গতির দ্রুততা ও উচ্চারণকালে ক্রমাগত শ্বাসগ্রহণের চাপ চঞ্চল ভাবটিকে উন্মোচিত করে। সাধারণত এই ছন্দে ছড়া রচিত হয়। সেজন্য একে ছড়ার ছন্দ বা লৌকিক ছন্দ বলে। অপরদিকে কবি বাণী বা ধ্বনিকে প্রাধান্য দিতে ইচ্ছুক হলে সাধারণত মাত্রাবৃত্ত ছন্দের আশ্রয় নেন। সেখানে মুক্তদল একমাত্রা এবং রুদ্ধদল দুইমাত্রা হওয়ায় গতি তুলনামূলকভাবে মন্থর হয়ে আসে। লয় ধীর হয়ে শ্বাসের চাপটিকে কমিয়ে আনে। ফলে যুক্তধ্বনিগুলো বিশ্লিষ্ট হয়ে উচ্চারণ ভঙ্গি দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে
একটু সুরেলা ভঙ্গিমার সৃষ্টি হয়। সুরের প্রাধান্য না থাকলেও কিঞ্চিৎ সুরের কারণে কবিতাগুলিতে গীতিধর্মিতার উদ্ভব ঘটে।

মূলত: গীতিকবিতা রচনার ক্ষেত্রে কবিরা এই ছন্দের আশ্রয় গ্রহণ করে থাকেন। অক্ষরবৃত্ত ছন্দের বৈচিত্র্য ও ব্যাপকতার কথাটি একেবারেই না জানলে চলে না। তানপ্রধান এই ছন্দটির রুদ্ধদল বৈচিত্র্যময়। কোথাও একমাত্রা এবং কোথাও দুইমাত্রা হয়ে কবিতাগুলোকে সুরের আবহে ডুবিয়ে দেয়। শব্দের শেষের রুদ্ধদল এবং একাক্ষরবিশিষ্ট রুদ্ধদল দুইমাত্রায় গঠিত হয়। অপর রুদ্ধদলটি একমাত্রা হয়ে কবিতার গতিকে একেবারে ধীর করে ফেলে। এতে সমগ্র কবিতার সুরময়ভঙ্গি আবৃত্তিকে ধীরলয়ে পরিবেশনের সুযোগ তৈরি করে দেয়। পুঁথি, মর্সিয়া, জারি-সারি, এমনকি মহাকাব্য রচনায় এই ছন্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ধীরলয়ের কারণে এতে শ্বাসাঘাতের প্রয়োজন পড়ে না, ধ্বনির প্রাধান্য ক্ষুন্ন হয় এবং সুরের আধিক্য পরিলক্ষিত হতে থাকে। ফলে কবিতার চলনভঙ্গি হয়ে ওঠে সাধারণ বা কথ্য ধরনের। অমিত্রাক্ষর ছন্দের কবিতার আবৃত্তি ইদানিং খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। তবে আবৃত্তি করতে হলে এই ছন্দ সম্পর্কে কিছু জেনে রাখা প্রয়োজন। অক্ষরবৃত্তের মতোই চৌদ্দ (আট+ছয়) মাত্রার চলন হলেও অমিত্রাক্ষরের গঠনে বিস্তর ফারাক রয়েছে। কবিতাগুলি অপেক্ষাকৃত জীবনোপযোগী হওয়ায় নিত্যনতুন ক্রিয়াপদের ব্যবহারে গীতিধর্ম থেকে মুক্ত হয়ে স্বচ্ছন্দ গতি ও স্পন্দন তৈরির মাধ্যমে আবৃত্তিকে শ্রুতিরঞ্জক করার সুযোগ থাকে। অমিত্রাক্ষরে অন্তমিল থাকে না, চরণের শেষে অনুপ্রাস ব্যবহার করা হয় না। চরণান্তিক যতির সঙ্গে ছেদের মিত্রতা থাকে না এবং
অর্থের দ্বারা যতিকে লঙ্ঘন করে ছন্দকে বক্তব্য বিষয়ের অধীন রাখা হয়। তাছাড়া প্রচুর তৎসম ও সমাসবদ্ধ শব্দ ব্যবহারের ফলে গাম্ভীর্যপূর্ণ, ধ্বনিময়, সংগীতমুখর ও তরঙ্গিত হয়ে ওঠে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে অমিত্রাক্ষর ছন্দে অন্তমিল প্রবহমান পয়ার সৃষ্টি করা হয়। সেজন্য একে সমিল অমিত্রাক্ষরও বলা হয়। কিন্তু অমিল প্রবহমান পয়ারে অন্তমিল থাকে না। অমিত্রাক্ষর পয়ারের বেড়ি ভেঙে বেরিয়ে এলেও চৌদ্দ মাত্রার সাবেকি চালটিকে বর্জন করতে পারেনি। পয়ারধর্মী কবিতার মুক্তির লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ মুক্তকছন্দের আশ্রয় নেন। মুক্তকছন্দে পংক্তির মাত্রাসংখ্যা নির্দিষ্ট নয় এবং ছেদ অনুযায়ী পর্ব বিভাজিত হয়ে অসমমাত্রার দীর্ঘচরণ হয়ে থাকে। অর্থবিভাগভিত্তিক পংক্তিরশেষে অনুপ্রাস এবং অন্তমিলের ব্যবহার হয়। অমিত্রাক্ষরের অনুরূপ প্রবহমানতায় যতিকে উপেক্ষা করা হয় এবং গীতিধর্মিতা ও শ্রুতিমাধুর্যের বিষয়টি রক্ষা করা হয়ে থাকে।

গদ্যকবিতায় কথাকে ভাব অনুযায়ী সাজিয়ে সূক্ষ ছন্দ প্রস্ফুটিত করা হয়। যতি ও পংক্তি বিভাগ ভাবের অনুবর্তী। ফলে যতি দ্বারা পর্ব বিভক্ত না হয়ে ছেদ দ্বারা বিভক্ত হয়। কৃত্রিম বিন্যাসপদ্ধতি বর্জনে এই ছন্দের পর্ব অসমমাত্রিক হওয়ায় নির্দিষ্ট কোনো ছন্দবদ্ধতা নেই। চরণের দৈর্ঘ্য অর্থ অনুযায়ী স্বাধীন এবং সাধারণত সংগীতধর্মী হয় না, অর্থ প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষণ বা অতিরিক্ত শব্দ ব্যবহার হয় না এবং চলিত ভাষা ব্যবহৃত হয়। এতে বাস্তবজীবনের খুঁটিনাটির মাধ্যমে জীবনধর্মী হয়ে ওঠে। ছন্দজ্ঞান থাকলে তাকে অনুসরণ করে কবিতার অন্তর্নিহিত ভাবটিকে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। আবার এই জ্ঞানের ফলে অর্থকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য প্রয়োজনবোধে ছন্দের চলনভঙ্গিটিকে বৈচিত্র্যময় করে স্বরনিক্ষেপ করা সহজতর হয়। ছন্দজ্ঞানের অভাবে কবিতার তালটিকে হারিয়ে ত্রুটিপূর্ণ প্রস্বর ও যতির প্রয়োগে আবৃত্তির মর্ম উদ্ধার সম্ভব হয় না। অনেকক্ষেত্রে শিল্পীর মন্দ্রমধুর স্বরের অনুরণনে কবিতাটি শুনতে মন্দ না লাগলেও কবিতার অর্থ, মূলভাব ও বিষয়বস্তু শ্রোতার হৃদয়ঙ্গম হয় না। বাণীর মর্মার্থ না বুঝেও শিল্পীর ভরাট অথবা সুরেলা কণ্ঠের খেলায় চমৎকৃত হয়ে শ্রোতারা করতালি দিতে থাকেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে

শিল্পী নিজেও কবিতার মর্মার্থ অনুধাবন করতে না পেরে প্রবল চিৎকারে কণ্ঠের দাপট দেখিয়ে অথবা ভিন্ন কোন ভঙ্গিমার আশ্রয় নিয়ে শ্রোতাকে মায়াজালে আবদ্ধ রাখার ভ্রান্তিকর প্রয়াস চালিয়ে যেতে থাকেন। নির্বাচিত কবিতাটির বিষয়বস্তু, ছন্দ-তাল, ভাব-রসের ব্যাপারে গভীর অভিনিবেশ সহকারে অনুশীলনের প্রয়োজন রয়েছে। ভাসা-ভাসা জ্ঞানে আবৃত্তির প্রচেষ্টা শিল্পী ও শিল্পের সার্বিক মানোন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ব্যাপকহারে এরকম ঘটতে থাকলে আবৃত্তি সম্পর্কে শ্রোতা-দর্শকের আগ্রহ হ্রাস পাবে। নতুন নতুন শ্রোতা ভুল বার্তা পৌঁছে দেবেন অনাগত শ্রোতার কাছে। সংগীত, নৃত্যকলা, নাট্যকলা, চিত্রকলায় শিক্ষা প্রদানের জন্য নিম্ন স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাক্রম চালু রয়েছে। কিন্তু সেরকম কোনো স্তরভিত্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষাক্রমের ব্যবস্থা না থাকায় নবীন আবৃত্তিশিল্পীগণ বৃহত্তর কর্মক্ষেত্রে নিজেকে উপস্থাপনের জন্য যথেষ্ট সুযোগপ্রাপ্তি হতে বঞ্চিত হবেন।

লেখকঃ  প্রশিক্ষক, নির্দেশক ও আবৃত্তিশিল্পী

শ্রুতিকথা/সোহেল মুন্সী 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই রকম আরো