রবিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২১, ০৩:২৯ পূর্বাহ্ন

‘প্রমা’ শুধু আবৃত্তি সংগঠনই নয়, একটি আন্দোলনের নাম

  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৫০২ বার দেখেছে

ঢাকাঃ  আশির দশকে বাংলাদেশ যখন ঘোর কৃষ্ণকাল। স্বৈরাচারের বুটের আঘাত মুক্তবুদ্ধি মানবতা। চরম লাঞ্ছনার শিকার শুভ ও শ্রেয়বোধের মানুষ। মৌলবাদ আর সাম্প্রদায়িকতার তূমুল উত্থানে দিশাহারা প্রগতিশীল মানুষ। সময়ের এই বৈরীকাল খন্ডে দারিয়ে বিক্ষুব্ধ কালের গর্ভে তারুণ্যের স্পর্ধা নিয়ে রচিত হয়  প্রমার পরিকল্পনা।

তাই প্রমা জন্ম থেকেই দ্রোহী।  নিরন্তর প্রতিবাদমুখর। শিল্পের আয়ুধ নিয়ে লড়াকু সৈনিক।গত দুই যুগের শিল্প সাধনায় প্রমার এই চরিত্র বৈশিষ্ট্যই প্রাধান্য পেয়েছে।

হ্যা, প্রমা একটি আবৃত্তি সংগঠন। শুধু আবৃত্তিই নয়, একটা আন্দোলন এর নাম। প্রমার  যাত্রাকাল ২৯ নভেম্বর ১৯৯০।কালের নিয়মে, সময়ের নির্দেশ মেনে, শিল্প ও সমাজের রুঢ় বাস্তবতায় অনিবার্য প্রয়োজনে প্রমার আবির্ভাব। ভুঁইফোঁড় কোনো আচমকা উদ্ভাস নয়। চিন্তা ও চর্চার মাঝে জড়িয়ে আছে প্রমার স্বরূপ পরিচয়।   আবৃত্তিকে তারা শুধু শিল্পের জন্য শিল্প সৃষ্টির তাগিদ ও মনে করে না। মানুষ ও সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে সহায়ক শক্তি হিসেবে প্রমা আবৃত্তি অনুশীলন করে।

জীবন পলায়নপর অথবা প্রসাদনপ্রিয় শিল্পচর্চায় আস্থাহীন বলেই প্রমা প্রেমে- শ্রমে-ঘামে, দ্রহে ও সংগ্রামে প্রতিমূহর্তে আছে প্রতিবাদী মানুষের পাশাপাশি।

সামাজিক আন্দোলন সংগ্রামে, রাজনৈতিক পালাবদল, মৌলবাদ, জঙ্গীবাদ ও স্বাধীনতার পরাজিত নতজানু
নয়। তারা ভীত নয় কোনো অপশক্তির কাছে।  যখন ঘনিয়ে আসে ঘোর তসমা আশাহত হয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, কালের যাত্রায় যখন দেখা দেয়  বিভ্রান্ত সময়, বৈরী সে কালের মুখোমুখি দাড়িয়ে প্রমা উচ্চারণ করে সাহসের বিশ্বস্ত কোরাস। প্রমার উচ্চারণগুলো আমাদের যাপিত জীবনের বাচার প্রেরণা। মঞ্চে ময়দানে মানুষের মুক্তির পক্ষে নিবেদিত প্রমার পংক্তিমালা।

প্রমার পরিবেশনা বহুমাত্রিক ও বৈচিত্রাপূর্ণ। উপস্থাপনা শৈল্পিক সুষমামণ্ডিত। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী এ দলটি আয়োজন করে ‘স্বাধীনতা উৎসব’। বুদ্ধিজীবী হত্যার কালো রাত্রে প্রমার কর্মীরা মাঙ্গলিক কৃত্যাচার সহোযোগে শহীদ মিনারে সমবেত হয় মৃত্যঞ্জয়ী রাতের শপথ নিয়ে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আমৃত্য সংগ্রামী মহীয়সী নারী জাহানারা ইমামের মৃত্যু দিন স্বরণে আয়োজিত হয় ‘শহীদ জননীর মৃত্যু নাই’ শিরোনামে শ্রদ্ধানুষ্ঠান। কবি শামসুর রাহমান এবং দ্রোহী সাহিত্যিক হুমায়ন আজাদের মৃত্যু দিবসে অনুষ্ঠিত হয় যথাক্রমে ‘তুমি নিঃশ্বাস তুমিই হৃদস্পন্দন’ এবং ‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ শিরোনামে স্মৃতি ও স্বরণের আয়োজন। ঋতুভিত্তিক দুটি আয়োজন করে প্রমা। শ্রাবনের প্রথম দিবসে কথা ও কবিতার বৈঠকী আয়োজন ‘ শ্রাবণের কবিতা আড্ডা’ এবং ঋতুরাজকে আহবান করে অনুষ্ঠিত হয় ‘ বসন্ত উৎসব’। প্রমার নিজস্ব শিল্পীদের চর্চা ও প্রস্তুতির জন্য রয়েছে দুটী প্ল্যাটফর্ম। নবীন শিল্পীদের অভিষেক মঞ্চ হলো’ হৃদয়ে শুনি কবিতার ধ্বনি’ এবং উদীয়মান আবৃত্তিশিল্পীদের জন্য ‘ কালের পথে কাব্যরথ।

নিয়মিত আয়োজন ছাড়াও বিভিন্ন সময় প্রমা কর্তৃক পরিবেশিত হয় একাধিক পূর্ণাঙ্গ আবৃত্তি প্রযোজনা। উল্লেখযোগ্য প্রযোজনাগুলো হলোঃ আনিসুল হকের উপন্যাস অবিলম্বনে ‘মা’, সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কথা অবলম্বনে ‘ স্মৃতি একাত্তর ‘ গ্রন্থিত প্রযোজনা ‘জননী বাংলা’  জসীমউদ্দিনের কাব্য অবলম্বনে ‘সোজন বদিয়ার ঘাট’, শিশুদের অংশগ্রহণে শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘স্বপ্নে হারাই অচিনপুর’,’ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না ‘ ভাবি যাহা মনে, এবং রাম রাবণের ছড়া। মঞ্চে ও মাঠে প্রমার বেশ কিছু বৃন্দ নির্মাণ দর্শন প্রিয়তা লাভ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মানুষ জাগবে ফের, রাজপথে জনপদে,  অন্তর মম বিকশিত করো, জয় নিপীড়িত জনগণের জয়, চিরকালের প্রমিথিউস।

বিজয়মঞ্চের অনুষ্ঠান সহ  বিভিন্ন দলের উৎসবে প্রমার পরিবেশনা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রমার সাংগঠনিক দক্ষতা, শক্তি ও সামর্থ্যর পরিচয় ‘প্রমা আবৃত্তি উৎসব ‘।  এ সব উৎসবে ঢাকা সহ কলকাতার শীর্ষ স্থানীয় আবৃত্তি ও সংগঠন এবং অজস্র দর্শক অংশগ্রহণ করেছে প্রাণের আনন্দে।

নিজস্ব উৎসব আয়োজনের পাশাপাশি জাতীয় ও আঞ্চলিক আবৃত্তি উৎসবেও প্রযোজনা করেছে প্রমা। উল্লেখযোগ্য হলো ; বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ আয়োজিত ‘জাতীয় আবৃত্তি উৎসব ‘। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে প্রমা এই মোর্চাটির সদস্য।

বাচিক শিল্পের প্রসারের লক্ষে প্রমা পরিচালনা করে চার মাস ব্যাপী আবৃত্তি কর্মশালা শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।
শুদ্ধ উচ্চারণ ও আবৃত্তি কর্মশালা শীর্ষক এ  কর্মসূচির আওতায় পাঁচ হাজারেরও অধিক প্রশিক্ষাণার্থী আবৃত্তির প্রাথমিক পাঠ গ্রহন করেছে। এসব কর্মশালায় প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রথিতযশা আবৃত্তি প্রশিক্ষকবৃন্দ।  এছাড়াও আবৃত্তি প্রেমী ও নবীন কর্মীদের জন্য  প্রকাশ করেছে ‘ আবৃত্তির জন্য নির্বাচিত কবিতা’ সংকলন।

প্রতি বছর ১৯ নভেম্বর আনন্দময় উৎসব আমেজে পালিত হয় প্রমার জন্মদিন। নগরীর সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি মিলন মেলায় পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকের বিস্তৃত কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতি বছর পালন করা হয় প্রমা পদক ও সম্মাননা। শিল্প – সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সমাজকর্মে বিশেষ অবদানের জন্য এ পর্যন্ত প্রমার স্বীকৃতীজনরা হলেন,  ড. অনুপম সেন, সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, অরুন দাশ গুপ্ত,  আবুল মোমেন, আসাদুজ্জামান নূর, মাহবুব হাসান,  বেগম মুশতারী শফি, ড. মাহবুবুল হক, রনজিৎ রক্ষিত,  আশরাফুল আলম, ফেরদৌস আরা আলীম প্রমূখ সহ আরো অনেকে।

অন্য দিকে ঢাকার আবৃত্তি দল “স্বরকল্পন” দেশের শ্রেষ্ঠ আবৃত্তি সংগঠন হিসেবে সম্মাননা পদকে ভূষিত করেছে প্রমাকে।

অজস্র সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভীড়ে চট্টগ্রামের প্রমা স্পষ্টত ব্যাতিক্রম।  প্রমা এসব বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্যের চিহ্ন সুত্র ধারণ করে আগামীর পথ চলায় আরো শাণিত চেতনার পরিচয় দেবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

সম্পাদনায় –  সোহেল মুন্সী

শ্রুতিকথা/এসএম

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই রকম আরো