সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:১০ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে আবৃত্তির প্রসার সাংগঠনিক চর্চারই ফল: ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়

  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৩২৫ বার দেখেছে
ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়

ঢাকাঃ  বাংলাদেশের আবৃত্তি চর্চার ইতিহাসে অপরিহার্য এক নাম ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আবৃত্তি বিষয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক পাচ্ছেন এই গুণী শিল্পী। বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে একান্ত সংলাপে উঠে এসেছে তার আবৃত্তি জীবন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন শ্রুতিকথার সম্পাদক মাজহারুল হক লিপু।

শ্রুতিকথাঃ শৈশবের ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে জানতে চাই।

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ  আমার শৈশব কেটেছে খুলনা শহরে। প্রথমে মডেল স্কুল তারপর সেন্ট জোশেফ হাইস্কুলে পড়তাম। সেন্ট জোশেফ স্কুলে সংস্কৃতি চর্চার দারুণ পরিবেশ ছিলো। এমনিতেই আমার বাড়িটাই ছিলো একটা সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র। বাবা ছিলেন নাট্য অভিনেতা, নির্দেশক। সাথে আবৃত্তিও করতেন। মা সেতার বাজাতেন। দিদি ছিলেন সংগীত শিল্পী। বাড়িতে আকাশবাণী রেডিও শোনা হতো। সেখান থেকে আমি তখনই চিনে ফেলেছি  শম্ভু মিত্র,কাজী সব্যসাচী, পার্থ ঘোষ, গৌরী ঘোষ, বীরেন্দ্র কিশোর ভদ্র, ইন্দিরা দেবীসহ বিশিষ্ট বাচিকশিল্পীদেরকে। বাবা লোহিত কান্তি বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি কোলকাতার মঞ্চেও অভিনয় করতেন। বাবা রবীন্দ্রনাথের সামনে তাঁর শেষ রক্ষা নাটকে অভিনয় করেছেন। রবীন্দ্রনাথ সেদিন বাবাকে প্রশংসা করেছিলেন। বাবাকে দেখতাম, ভোরবেলা উঠে রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কালিদাসের বিভিন্ন কবিতা, গীতাসহ বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে শ্লোক একটার পর একটা আবৃত্তি করে যাচ্ছেন। আমি মূলতঃ সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়ে স্কুলের সব অনুষ্ঠানে দাপটের সাথেই অংশ নেওয়া শুরু করলাম। এখান থেকেই আমার আবৃত্তি চর্চার শুরু।

শ্রুতিকথাঃ আপনার যৌবন তো কেটেছে একটি কঠিন সময়ে। সেই উত্তাল সময়গুলো সম্পর্কে বলুন ?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ  ১৯৭০ সালে রেডিও পাকিস্তান খুলনা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই আমি বেতারে কাজ শুরু করি। এসময় আবৃত্তি নিয়ে কোন অনুষ্ঠান না থাকলেও কবিতা নিয়ে অনুষ্ঠান থাকত। আমি তখন কবিতা লিখতাম এবং লিটল ম্যাগাজিনের সাথে যুক্ত ছিলাম। একই সাথে জড়িয়ে পড়েছিলাম রাজনীতিতেও।৩ মার্চ আমরা খুলনায় বিশাল সভা সমাবেশ করি। এসময় সেনা কর্মকর্তা কাহুতের নেতৃত্বে শহরের বিভিন্ন স্থানে গুলি চালানো হয়। গুলিতে নিহত হন শহীদ হাদিস, শহীদ আলতাফসহ কয়েকজন। এরপর থেকে দফায় দফায় পাকসেনাদের সাথে আমাদের আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ চলত। আমরা হাতে তৈরি ক্র‍্যাক নিক্ষেপ করতাম সৈন্যদের উপর। ২৮ মার্চ খুলনায় ৮ জন হিন্দু ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে খুন করা হয়। তখন খুলনার প্রেক্ষাপট পালটে যায়। আমরাও চলে যাই ডুমুরিয়ায় আমাদের গ্রামের বাড়িতে। তারপর প্রথমে একটা নৌকায় করে পরিবারের সবাই ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। পরে অনেকে মিলে কোলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা করি ভিন্ন পথে। কখনো নৌকায়, কখনো পায়ে হেঁটে। সে এক নির্মম অভিজ্ঞতা। পথের মধ্যে মিলিটারিদের গুলি। কখনো দলহারা হয়ে গেছি। অবশেষে পৌঁছে যাই কোলকাতা হাবরায় বাবার এক ছাত্রের বাড়ি।

হাবড়ার ওই বাড়িতে বেশিদিন থাকা হয়নি আমাদের। পরে খুলনার একটি পরিবার আমাদেরকে একটা বস্তিতে আশ্রয় দেয়। সেখানে আমাদের পরিবারের সবার আশ্রয় হয়নি। আমরা দুভাগে দু যায়গায় ছিলাম। আমি হাবরার শরনার্থী শিবিরের ভলেন্টিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করি। কোলকাতার বিভিন্ন স্থান থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করতাম। আর হাবরা ক্যাম্প থেকে যা পেতাম সেই চাল, ডাল বাড়িতে আনতাম। আমার ভাই সেটা রান্না করত।

শ্রুতিকথাঃ কোলকাতায় অবস্থানকালে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করেননি?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ তখন নিজেকে সংস্কৃতির সাথে যুক্ত করার সময় হত না। ত্রাণ শিবিরের কাজের সাথে আমরা বাংলাদেশের খবর সম্পর্কিত পেপার বিক্রি করে বেড়াতাম। এরকমই একটা সময় জানতে পারলাম ওয়াহিদুল হক, সনজিদা খাতুন, সৈয়দ হাসান ইমাম, আলী যাকের, শাহীন সামাদ, মাহমুদুর রহমান বেনুসহ অনেকে একটা জায়গায় গানের বৈঠক করেন। আমার বোন দীপা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী। তাকে জানাতেই তিনি আগ্রহ দেখালেন। আমি দিদিকে সেখানে নিয়ে গেলাম। দিদি নিয়মিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থায় গান করতে লাগলেন। আগে থেকে তিনি আকাশবাণীতেও কাজ করতেন। আমার কাজ ছিলো দিদিকে পৌঁছে দেওয়া। এসব বরেণ্য ব্যক্তির সাথে আমার বেশ সখ্যতা গড়ে ওঠে তখন। কিন্তু শরণার্থী শিবিরে এত ব্যস্ত থাকতাম যে আমি সংস্কৃতি অঙ্গনে সময় দিতে পারিনি।

তারপরও আমি কবিতা লিখতাম। কবি গোলাম সাবদার সিদ্দিক সম্পাদিত একটি পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলাম। মাঝেমধ্যে কফি হাউজে যেতাম। এখানে দেখতাম নিয়মিত আড্ডা দিতেন নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা এবং আল মাহমুদ। তবে পরবর্তীতে আমরা যাদবপুর অঞ্চলে বাসা নেওয়ায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সুনীল কুমার চট্রোপাধ্যায়ের সাথে নিয়মিত গান আবৃত্তির আসর শুরু হলো। আমাদের বাড়িতে তখন আমার স্যার মুহাম্মদ কায়কোবাদ , আব্দুল গনি ছাড়াও নিয়মিত আড্ডা দিতে আসতেন আব্দুল গাফফার চৌধুরীও। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু অনুষ্ঠানে, কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং বিভিন্ন শরনার্থী শিবিরে আমি আবৃত্তি পরিবেশন করি। এই পরিবেশনাগুলো দর্শকদেরকে আলোড়িত করত যা ভাবলে এখনো আমি শিহরিত হই। তবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমি যুক্ত হতে পারিনি অন্য কাজের ব্যস্ততায়। তখন আমার মনে হয়েছে ঐ কাজগুলোই বেশি জরুরি।

শ্রুতিকথাঃ খুলনা ফিরে আবার যুক্ত হলেন আবৃত্তিতে। আমার জানা মতে আপনি বাংলাদেশের প্রথম সাংগঠনিক আবৃত্তি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এটা কি সত্যি?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও খুলনা মুক্ত হয় ১৭ ডিসেম্বর। আমি ওইদিনই খুলনা ফিরে আসি। আমার নিজের তখন থাকার যায়গা নেই। কায়কোবাদ স্যারের বাড়িতে উঠি। এখান থেকে আবার শুরু হয় রেডিও অনুষ্ঠান। তখন বেতারের কর্মকর্তা ছিলেন আশফাকুর রহমান চৌধুরী। আমার আবৃত্তি জীবনও শুরু হলো আবার। কচি কাঁচার আসর, খেলাঘরের অনেক সদস্যদের নিয়ে আবৃত্তি চর্চা শুরু করলাম। এদের নিয়েই ১৯৭৪ সালে শুরু করলাম খুলনা আবৃত্তি সংসদ। আমি আহবায়ক আর এড. ফিরোজ আহমেদ হলেন সদস্য সচিব। আব্দুর সবুর খান চৌধুরী, সৈয়দ আব্দুল মতিনসহ আরো অনেককে নিয়ে প্রথম অনুষ্ঠান করলাম শহীদ আলতাফ মিলনায়তনে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কবি মোহাম্মদ রফিক। এছাড়াও ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অসিত বরণ ঘোষ। আমি দাবি করছিনা যে এটাই দেশের প্রথম আবৃত্তি সংগঠন। তবে, এর আগে কোন সংগঠন ছিলো বলে আমার জানা নেই।

শ্রুতিকথাঃ ঢাকায় কিভাবে শুরু হলো ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ  স্বাধীনতার পর আমি খুলনাতে সাংবাদিকতা শুরু করি। সেই সময়ে ডাক দিয়ে যায় নামে একটি সাপ্তাহিকে কাজ করতাম। পরবর্তীতে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ফয়েজ আহমেদের সম্পাদনায় বঙ্গবার্তা নামের একটি দৈনিকে সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতাম। এরই মধ্যে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হলে বাড়ির সবাই পরামর্শ দেয় ঢাকা যেতে। যেহেতু আমি সৃজনশীল কাজে যুক্ত ছিলাম, তাই সবার ইচ্ছা ছিলো আমি ঢাকা গিয়ে এসব সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত হই। আমি যখন ঢাকা গেলাম তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ভর্তি পরীক্ষা শেষ। শুধু আমার জন্যই বসানো হলো ভাইভা বোর্ড। যাই হোক, অনেক কষ্টে ভর্তি হলাম সেখানে। ততদিনে আমি খুলনা বেতার থেকে মাইগ্রেশন নিয়ে ঢাকা বেতারে যোগ দিয়েছি। এখানে শুরু করলাম মহানগর এবং উত্তরণ অনুষ্ঠান। এসময় উত্তরণ অনুষ্ঠান করতেন আনিস আহমেদ, কাজী আরিফ, প্রজ্ঞা লাবনী, শফি কামাল, রায়হান গফুরসহ আরো অনেকে। পাঁচমিশালি এ অনুষ্ঠান খুব জনপ্রিয় ছিলো। এর সাথে আমি যোগ দিলাম নাট্যচক্রে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক সংসদে।

শ্রুতিকথাঃ নাটকে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার ভাবনা কিভাবে এলো?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ তখন নাট্য জগতের অনেকেই ভারতের এনএসডিতে (ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা)পড়াশোনা করছে বা করে এসেছে। আমিও ভাবলাম একটু চেষ্টা করে দেখি। ভাইভা বোর্ডে ছিলেন রামেন্দু মজুমদার, আলী যাকের, আসাফ উদ্দৌলাহ সহ আরো অনেকে। আমাকে বলা হলো আবৃত্তি করতে। আমি তো মহা খুশি। পরপর দুটি আবৃত্তি শুনে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হলো। আমি নির্বাচিত হলাম এবং ১৯৭৮ সালে চলে গেলাম এনএসডিতে। সেখানে পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা করলাম। । দিল্লি থেকে চলে এলাম কোলকাতায় বিখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব রুদ্র প্রসাদ সেন গুপ্তর আমন্ত্রণে। তার বিখ্যাত নাটকের দল নান্দীকারে কাজ শুরু করলাম। বেশ কয়েকটি প্রযোজনায় নানা দিক নিয়ে কাজ করতাম।

শ্রুতিকথাঃ ফিরে এলেন তো শুধুই নাটকের লোক হয়ে। আবৃত্তি কিভাবে আবার শুরু করলেন?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ ১৯৮২ সালে ফিরে এলাম ঢাকায়। নাট্যচক্রের হয়ে নিয়মিত মঞ্চে অভিনয় এবং দলের নাট্য শিক্ষাঙ্গনে প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পেলাম। একইসাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলে আবৃত্তি বিভাগে যুক্ত হলাম। এসময়ই মূলত জড়িত হলাম আবৃত্তি প্রশিক্ষণে। শিল্পকলা একাডেমি আমাকে দায়িত্ব দিলো১৫ দিনের একটি আবৃত্তি কর্মশালা করতে। প্রথমবারের মত আমি সিলেবাস করে সেই কর্মশালাটি পরিচালনা করি। এসময় যারা কর্মশালায় অংশ নেয় তাদের নিয়ে একটি দলও প্রতিষ্ঠিত হয় ঐকতান নামে। তবে কিছু সমস্যার কারণে ঐকতানের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এসময় কবি আসাদ চৌধুরী আমাকে বিটিভিতে বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশনের আমন্ত্রণ জানালেন। অনেক রিহার্সেল করে বিটিভির ইতিহাসে প্রথম পরিবেশিত হলো বৃন্দ আবৃত্তি। আমি পরিচালক হিসেবে কাজ করছি সেটাও দৃশ্যায়ন হলো। কয়েকটি প্রযোজনা পরিবেশিত হয় এ অনুষ্ঠানে। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি। এর পর পরই ঢাকায় স্বরিত নামে একটি আবৃত্তি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হলো। একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হলো স্বরশ্রুতি ও কণ্ঠশীলন। আমরাও ঐকতানকে নতুন নাম দিয়ে শুরু করলাম। ১৯৮৫ সালের জুলাই মাসে যাত্রা শুরু করলাম কথা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র নামে।

শ্রুতিকথাঃ বাংলাদেশের আবৃত্তি চর্চার ইতিহাসে বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ নামটি অপরিহার্য। আপনি এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ইতিহাসটা বলবেন কি?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হককে সভাপতি করে একটি আবৃত্তি ফেডারেশন তৈরি হয়েছিলো ঢাকার দলগুলো নিয়ে। যে কারণেই হোক, সেটা খুব বেশিদূর যেতে পারেনি। আমি তখন জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে কর্মরত। হাসান আরিফ, সাগর লোহানী, ইস্তেকবাল হোসেন আমার অফিসে প্রায়ই আসত সব দলগুলো নিয়ে নতুন কিছু করা যায় কিনা। আমি প্রথমে রাজি না হলেও ওদের আগ্রহ দেখে না বলতে পারিনি। আমাকে আহবায়ক করে বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের যাত্রা শুরু হলো। ১৯৯৫ বাংলা সনের (১৯৮৭ সাল) পহেলা বৈশাখে বৃটিশ কাউন্সিল মিলনায়তনে আমরা প্রথম আবৃত্তি উৎসব করলাম । তিনদিন ব্যাপী এ উৎসবে ঢাকা ছাড়াও বাইরের কয়েকটি দল দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন করে। এছাড়া একক পরিবেশনাও ছিলো সেই থেকে শুরু হলো জাতীয় আবৃত্তি উৎসব। ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো আবৃত্তি সংগঠন। প্রথম কাউন্সিলে আমাকে সভাপতি এবং সাগর লোহানীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।

শ্রুতিকথাঃ কোনটি বেশি উপভোগ করেন, দলীয় আবৃত্তি না একক আবৃত্তি ?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ দুটোর আবেদন দুরকম। একা যখন মঞ্চে উঠি তখন নিজের পরিবেশনা নিয়ে তৃপ্তি বা অতৃপ্তি থাকে। অন্যদিকে দলীয় পরিবেশনা একদিনের ব্যাপার নয়। এর পেছনে থাকে সম্মিলিত শ্রম। ভালো হলে কৃতিত্ব সবার। এখানে সফলতা ভাগ করে নেওয়ার মজাটা আবার আলাদা। যারা দলের সাথে কাজ করে শুধু তারাই বুঝবে।

শ্রুতিকথাঃ কথার প্রযোজনা গুলোতে আপনার একটা ভূমিকা থাকে সবসময়। এটা উপভোগ করেন নিশ্চয়?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ আসলে অনেকদিন হলো কথায় কাজ করছি। একসময় সব নির্দেশনা আমিই দিতাম। তখন যারা কম বয়সী ছিলো তারা এখন পরিণত বয়সের। এখন ওরাও নির্দেশনা দিতে পারে এবং দিচ্ছেও। তবে সব প্রযোজনাকে আমার নিজের বলে মনে হয়। কথা আমার নিজের পরিবারের মত।

শ্রুতিকথাঃ আপনি তো পড়াশোনা করেছেন নাটক নিয়ে। আবৃত্তি নির্দেশনায় তার প্রভাব পড়ে কি?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ এটা একটা সুন্দর প্রশ্ন। আমি দেশে ফেরার পর সবকটি আবৃত্তি প্রযোজনায় নতুন নতুন নিরীক্ষার চেষ্টা করেছি। আমাদের অন্যতম প্রযোজনা পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় এর দুই শতাধিক শো হয়েছে। এর মধ্যে আমি সেট, লাইট, মিউজিক নিয়ে নানা মাত্রা যোগ করেছি। বেশ কয়েকবার আমরা পশ্চিমবঙ্গে অনুষ্ঠান করেছি। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় এর একটি শো’তে রণেশ দাশ গুপ্ত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন। এরকম নতুন মাত্রার প্রযোজনা দেখে রণেশ দা আমাকে বলেছিলেন, আবৃত্তি নিয়ে যে এরকম প্রযোজনা হতে পারে আমি ভাবতেও পারিনি। কথায় আমার প্রথম নীরিক্ষা ছিলো খন্দকার আশরাফ হোসেনের রচনায় নোটনের জন্য শোক। এরপর আবৃত্তি প্রযোজনায় নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা হচ্ছে দুই বাংলাতেই। কথাও সেই ধারা অব্যাহত রেখেছে।

শ্রুতিকথাঃ ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় তো নাটকের মানুষ। তারপরও, একুশে পদক পেলেন আবৃত্তিতে। শুধু তাই নয়, এটি ইতিহাসের প্রথম আবৃত্তিতে একুশে পদক। আপনার অনুভুতি?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ নাটক নিয়ে পড়েছি এটা ঠিক। নিয়মিত নাটকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্লাস নিচ্ছি। কিন্তু, আবৃত্তি আমার প্যাশন। ছোটবেলা থেকেই আবৃত্তির সাথে জড়িয়ে গেছি। আবৃত্তি করি ভালোবাসার টানে। ভালোবাসার জায়গায় একটি স্বীকৃতি পেলে কার না ভালো লাগে।

শ্রুতিকথাঃ বর্তমান আবৃত্তি চর্চা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কেমন? আবৃত্তি নিয়ে কোন স্বপ্ন দেখেন কি?.

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ ভালোই তো চলছে আবৃত্তি চর্চা। সারাদেশে এখন চার শতাধিক দল কাজ করছে। আমিও কাজ করছি। সাংগঠনিক চর্চার কারণে বাংলাদেশে প্রচুর আবৃত্তি শিল্পী ও কর্মী গড়ে উঠেছে। নতুন নতুন ভাবনা যোগ হচ্ছে। বাংলাদেশে আবৃত্তির প্রসার সাংগঠনিক চর্চারই ফল।এভাবে চললেই হবে।

শ্রুতিকথাঃ আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। একুশে পদক প্রাপ্তিতে অভিনন্দন।

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ তোমাকেও ধন্যবাদ।

 

শ্রুতিকথা/সোহেল 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই রকম আরো